১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ভোর ৫:৪৫
১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ভোর ৫:৪৫

সভ্যতার উত্থান পতন :রক্তে লেখা ইতিহাস (১১তম পর্ব)- আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ্।

Share Option;

জাহেলি যুগে এক নির্ভেজাল মানুষ
পৃথিবীজুড়ে তখন অন্যায়, অন্ধকার আর মানবতার দীর্ঘশ্বাস। মানুষ মুক্তি খুঁজছে, কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ঠিক এমন এক সময়, নীরব মরুপ্রান্তরের শহর মক্কায় জন্ম নিলেন মুহাম্মাদ (সাঃ)যাঁর আগমন ছিল বিশ্ব পরিবর্তনের সূচনা।
সে রাতটি ছিল সাধারণ কোনো রাত নয়। ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত আছে, দূর পারস্যে সম্রাট কিসরার প্রাসাদে কাঁপন ধরে, প্রাসাদের চৌদ্দটি বারান্দা ভেঙে পড়ে। হাজার বছর ধরে জ্বলা অগ্নিকুণ্ড হঠাৎ নিভে যায়। ইরাকের প্রসিদ্ধ সাওয়া হ্রদ শুকিয়ে পড়ে। যেন প্রকৃতি নিজেই ঘোষণা দিচ্ছিল.এক নতুন আলোর যুগ আসছে।
আকাশে অস্বাভাবিক এক নূরের উপস্থিতি অনুভূত হয় বলে বর্ণনা আছে। অন্ধকারের বুক চিরে আলো ফোটার পূর্বলক্ষণ যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। জুলুম, আগুনপূজা আর সাম্রাজ্যিক অহংকারের যুগ শেষের পথে.এমন এক অদৃশ্য বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে।
পারস্য ও রোমের পুরোহিতেরা অজানা অশান্তি অনুভব করছিলেন। প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসব্যবস্থার ভিত কেঁপে উঠছে.এমন এক অস্বস্তি তাদের মনে দোলা দিচ্ছিল। তারা জানতেন না, খুব শিগগিরই এমন এক নবীর আহ্বান আসবে, যিনি তাওহীদের ডাক দেবেন, আর সেই ডাক পৌঁছে যাবে রোমের প্রাসাদ পর্যন্ত।
আর এদিকে মক্কায়, কুরাইশদের ঘরে আনন্দের সংবাদ। আব্দুল মুত্তালিবের নাতি, আব্দুল্লাহ ও আমিনার ঘর আলো করে এক অসাধারণ শিশুর জন্ম। সবাই খুশি, কিন্তু কেউ জানে না.এই শিশুকেই আল্লাহ পাঠিয়েছেন মানবতার সবচেয়ে বড় দাওয়াতের দায়িত্ব দিয়ে। একদিন তাঁর কণ্ঠের আহ্বানে কেঁপে উঠবে সাম্রাজ্য, বদলে যাবে ইতিহাস, আর অন্ধকার পৃথিবী খুঁজে পাবে আলোর পথ।

সকল শিশুর মতোই বড় হতে থাকেন শিশু মুহাম্মদ সাঃ। কিন্তু তাঁর শৈশব ছিল এক অদ্ভুত আলোয় ভরা। বয়সে ছোট হলেও স্বভাব, চরিত্র ও আচরণে এমন এক ভারসাম্য ও ন্যায়বোধের ছাপ ছিল, যা তাঁকে সবার কাছে আলাদা করে তুলেছিল। শৈশব ও কৈশোরেই ইনসাফ, সত্যবাদিতা ও আমানতের দীপ্তি তাঁর মাঝে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
তিনি যখন দুধমা হালিমা সাদিয়ার ঘরে ছিলেন, সেই সময়টা হালিমার পরিবারে বরকতে ভরে ওঠে। বর্ণনায় পাওয়া যায়, তাঁর আগমনের পর ঘরে স্বচ্ছলতা আসে, পশুদের দুধ বেড়ে যায়, পরিবেশে নেমে আসে প্রশান্তি। তিনি সবার সঙ্গে কোমল ব্যবহার করতেন। পশুপাখির প্রতিও ছিলেন দয়ালু। ছোট বয়সেই তাঁর মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার পরিচয় ফুটে উঠতে শুরু করে।
কৈশোরে তিনি মক্কার আশপাশে ছাগল ও ভেড়া চরাতেন। রাখালের কাজ শুধু পশু চরানো নয়। এতে প্রয়োজন ধৈর্য, সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ। তিনি কোনো পশুকে অবহেলা করতেন না। দুর্বলটিকে আগলে রাখতেন, হারিয়ে গেলে খুঁজে আনতেন। এই সাধারণ কাজের মধ্য দিয়েই তাঁর মধ্যে ফুটে উঠছিল নেতৃত্ব, ন্যায়বোধ ও আমানতদারির চরিত্র।
এই কারণেই মক্কার মানুষ তাঁকে ডাকত “আল-আমিন” নামে। অর্থাৎ বিশ্বস্ত, আমানতদার। বয়সে তরুণ হলেও মানুষ তাদের মূল্যবান জিনিস তাঁর কাছে নিরাপদে রাখত। তিনি কখনো কারও আমানতে খেয়ানত করেননি, কখনো মিথ্যা বলেননি। সত্য বলা ও ন্যায় ধরে রাখা তাঁর স্বভাব হয়ে উঠেছিল। অসহায় দূর্বল মানুষের সহযোগিতা করা ছিল আরেকটি গুন যা দেখতি পাই হিলফুল ফুজুল গঠনের প্রেক্ষাপটে।
তখনকার সময়ে মক্কার সমাজে শক্তিশালীরাই ছিল প্রভাবশালী। দুর্বল, বিদেশি বা আশ্রয়হীন মানুষের জন্য ন্যায় পাওয়ার পথ ছিল খুবই কঠিন। এমন এক সময়, এক ইয়েমেনি ব্যবসায়ী মক্কায় এসে কিছু পণ্য বিক্রি করেছিলেন। প্রভাবশালী এক ব্যক্তি সেই পণ্য নিয়ে মূল্য পরিশোধ না করেই অস্বীকার করে বসে। অসহায় সেই মানুষটি ন্যায়বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সহায়তা পেলেন না।
অবশেষে তিনি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে নিজের ওপর হওয়া জুলুমের কথা বলতে থাকেন। তাঁর আর্তনাদ মক্কার বিবেকবান কিছু মানুষের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জরুরি। না হলে শক্তিশালীর জুলুম চলতেই থাকবে, আর দুর্বল মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি সম্মানিত গোত্র একত্রিত হয় আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে। সেখানে তারা একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়। সিদ্ধান্ত হয়, মক্কায় যে-ই জুলুমের শিকার হবে, সে যে-গোত্রেরই হোক, তার পাশে দাঁড়ানো হবে। তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। এই চুক্তির নাম দেওয়া হয় হিলফুল ফুজুল।
এই মহৎ উদ্যোগে তরুণ মুহাম্মদ সাঃ ও অংশ নেন। তিনি শুধু উপস্থিত ছিলেন না, বরং এই অঙ্গীকারকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি এই চুক্তির কথা স্মরণ করে বলেছেন, এমন একটি চুক্তিতে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। এমনকি ইসলাম প্রতিষ্ঠার পরও যদি এমন কোনো ন্যায়ভিত্তিক আহ্বান আসত, তিনি সাড়া দিতেন।
এতে প্রমাণ করে, নবুওয়তের আগেই তাঁর চরিত্রে ন্যায়বোধ, মানবিকতা ও দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় মানসিকতা কতটা গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।
মানুষের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন অটুট রাখতেও তিনি অসাধারণ ভূমিকা রাখতেন। তাঁর পরামর্শে সবাই স্বস্তি পেত, তাঁর উপস্থিতিতে বিরোধ শান্ত হয়ে যেত। এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল কাবা পুনর্নির্মাণের সময়।
কাবার দেয়াল পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ হলে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করার পালা আসে। এখানেই শুরু হয় বিরোধ। কোন গোত্র এই সম্মান পাবে, তা নিয়ে উত্তেজনা চরমে ওঠে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, সামান্য একটি সিদ্ধান্ত বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারত।
এই সময় উপস্থিত ছিলেন তরুণ মুহাম্মদ সাঃ । সবাই তাঁর বিচক্ষণতার ওপর আস্থা রাখত। তিনি একটি বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান প্রস্তাব করেন। একটি কাপড় বিছিয়ে তার ওপর হাজরে আসওয়াদ রাখা হয়। এরপর প্রত্যেক গোত্রপ্রধানকে সেই কাপড়ের কোণা ধরে একসঙ্গে তুলতে বলা হয়। পাথরটি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে তিনি নিজ হাতে তা স্থাপন করেন।
এতে সবার সম্মান রক্ষা হয়। কারও মনে ক্ষোভ থাকে না। সম্ভাব্য সংঘর্ষ শান্তিতে মিটে যায়। তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, প্রজ্ঞা ও ঐক্য রক্ষার দক্ষতা সবার কাছে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

আল-আমীন
জাহেলিয়াতের অন্ধকারে, যখন মানবতা হারিয়ে যাচ্ছিল স্বার্থ আর অবিচারের ভিড়ে, ঠিক সেই সময়েই উদিত হওয়া উজ্জ্বল নক্ষত্র মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ। যার আলো ছুঁয়ে যেত মানুষের হৃদয়, যার উপস্থিতি এনে দিত আস্থা ও শান্তির পরশ। সমাজের যে কোনো সমস্যায় তিনি ছিলেন আন্তরিক, ন্যায়পরায়ণ এবং সবার কাছে নির্ভরযোগ্য। তাঁর কথা ছিল সত্যের প্রতিধ্বনি, আর তাঁর আচরণ ছিল বিশ্বাসের প্রতীক।
কৈশোর বয়স থেকেই তাঁর জীবনে ফুটে উঠেছিল সততা, দায়িত্ববোধ এবং পরিশ্রমের এক অপূর্ব সমন্বয়। এই গুণাবলির জন্যই তাঁর চাচা আবু তালিব তাঁকে নিজের বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তখনকার মক্কা ছিল আরবের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।যেখান থেকে কাফেলা ছুটে যেত সুদূর সিরিয়া, ইয়েমেনসহ নানা দেশে। দীর্ঘ এই সফরগুলো ছিল শুধু পথচলা নয়, বরং ছিল জীবনের গভীর শিক্ষা নেওয়ার এক বাস্তব পাঠশালা।
এই যাত্রাপথেই তিনি শিখেছিলেন বাজারের ভাষা, লেনদেনের নিয়ম, দরকষাকষির কৌশল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাস্তবতা। প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁকে গড়ে তুলেছিল আরও পরিণত, আরও প্রজ্ঞাবান। তাঁর চরিত্রে ফুটে উঠেছিল দৃঢ়তা, সততা এবং নৈতিকতার এক অনন্য সমাহার।যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
তিনি শুধু একজন দক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সততা ও বিশ্বস্ততার জীবন্ত প্রতীক। তিনি কখনো প্রতারণা করতেন না, মিথ্যার আশ্রয় নিতেন না, এবং অন্যের সম্পদের প্রতি রাখতেন গভীর সম্মান ও দায়িত্ববোধ। তাঁর স্বচ্ছ চরিত্র মানুষকে মুগ্ধ করত, সহজেই জায়গা করে নিত সবার হৃদয়ে।
এই অটল সততা ও অবিচল বিশ্বাসযোগ্যতার কারণেই মক্কার মানুষ তাঁকে স্নেহভরে একটি নাম দিয়েছিল”আল-আমি” যার অর্থ, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। এটি ছিল না কেবল একটি উপাধি, বরং তাঁর নির্মল ব্যক্তিত্বের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি—এক উজ্জ্বল চরিত্রের জীবন্ত পরিচয়, যা যুগে যুগে মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা।

খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসা পরিচালনা-
মক্কার ব্যস্ত জনপদে তখন এক নাম মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ। সততা ও বিশ্বস্ততার জন্য মানুষ তাঁকে ডাকে আল-আমীন নামে। এমন এক সময়, যখন সমাজে বিশ্বাসের ঘাটতি ছিল প্রকট, তখন এই উপাধি কেবল একটি নাম নয়, ছিল চরিত্রের সনদ।
অন্যদিকে, সম্ভ্রান্ত ও ধনী ব্যবসায়ী খাদিজা (রা.) তাঁর বিস্তৃত বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সন্ধান করছিলেন। দূরদেশ সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা পাঠানো ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ। তিনি শেষ পর্যন্ত বেছে নিলেন সেই যুবককে, যার সততা নিয়ে শহরে কোনো প্রশ্ন ছিল না।
মুহাম্মদ (সা.) কাফেলার নেতৃত্বে সিরিয়ায় রওনা হলেন। সঙ্গে ছিলেন খাদিজা (রা.)-এর বিশ্বস্ত কর্মচারী মাইসারা। সফরটি শুধু সফলই হয়নি, বরং প্রত্যাশার চেয়ে বেশি লাভ এনে দেয়। কিন্তু আর্থিক সাফল্যের চেয়েও বড় ছিল একটি বিষয় চরিত্রের জয়। মাইসারা ফিরে এসে তাঁর ন্যায়পরায়ণতা, নম্রতা ও অসাধারণ আচরণের কথা প্রশংসাভরে বর্ণনা করেন।
এই আস্থা, এই সম্মান ধীরে ধীরে এক গভীর সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে তোলে। পরবর্তীতে তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ।

তিনি ব্যবসায়ে যে নীতি অবলম্বন করেছিলেন তাহলো
পণ্যের গুণগত মান কখনো গোপন করতেন না
অতিরিক্ত লাভের লোভে অন্যায় করতেন না
সময়মতো চুক্তি পূরণ করতেন
ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের অধিকার রক্ষা করতেন
তাঁর কাছে ব্যবসা কেবল অর্থ উপার্জনের পথ ছিল না। এটি ছিল চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্র, আত্মসংযমের অনুশীলন, মানুষের আস্থা অর্জনের মাধ্যম।
নবুয়ত লাভের আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত, তাঁর জীবন ছিল স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ। দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনে তিনি মানুষের হৃদয়ে যে বিশ্বাস গড়ে তুলেছিলেন, সেটিই পরবর্তীতে তাঁর সবচেয়ে বড় পুঁজি হয়ে দাঁড়ায়। যখন তিনি নবুয়তের ঘোষণা দেন, বিরোধীরা তাঁর আহ্বান অস্বীকার করলেও তাঁর চরিত্রে আঘাত হানতে পারেনি।
কারণ সত্যের প্রতি অটল এক ব্যবসায়ীর জীবনই তাঁকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দিয়েছিল।

নবী মুহাম্মাদ সাঃ এর উপর সর্বপ্রথম ইমান এনেছিলেন হযরতে খাদিজা রা। কারন নবুয়তের পূর্বে পনের বছরে দাম্পত্য জীবনে তিনি মুহাম্মদ সাঃ কে কাছে থেকে দেখেছিলেন। প্রথম যে চারদিকে সুনাম আর প্রশংসা শুনে আস্থা রেখে নিজ ব্যবসার ভার দিয়েছিলেন। ব্যবসা পরিচালনায় সততা ও কর্মনিষ্ঠা প্রজ্ঞাবান খাদিজা রা মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেখান থেকেই শুরু হয় আস্থার সম্পর্ক, যা পরে রূপ নেয় দাম্পত্যে। পৃথিবীর সেরা মানুষের সংসার জীবনের বাস্তব চিত্র চিত্রায়িত করতে অনেক সময় লাগবে লিখতে হবে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। অল্প করে কিছু বিষয় তুলে ধরাছি –
বিয়ের পর তাঁদের ঘর ছিল সরল, কিন্তু শান্তিতে ভরা। তিনি কখনো কঠোর স্বামী ছিলেন না। তিনি পরিবারের কাজে সহায়তা করতেন। কাপড় সেলাই, জুতা মেরামত, ঘরের ছোটখাটো কাজে হাত লাগানো ছিল তাঁর স্বাভাবিক অভ্যাস।
খাদিজা (রা.) ছিলেন তাঁর প্রথম শ্রোতা, প্রথম পরামর্শদাতা। দিনের ক্লান্তি শেষে তিনি স্ত্রীর কাছে বসে কথা বলতেন। ব্যবসা, সমাজের অবস্থা, মানুষের দুঃখ সব কিছু নিয়েই আলোচনা হতো। তাঁদের সম্পর্কের ভিত ছিল পারস্পরিক সম্মান।
নবী মুহাম্মদ (সা.) কখনো খাদিজা রা এর সম্পদের লোভ করেননি। অথচ খাদিজা (রা.) ছিলেন ধনী। আর খাদিজা রা ও কখনো তাঁর সম্পদ দিয়ে স্বামীকে ছোট করেননি। বরং ভালোবাসা দিয়ে শক্তি জুগিয়েছেন।
তাঁদের সংসারে সন্তান জন্ম নিল—কাসিম, যাঁর নামানুসারে মুহাম্মদ (সা.) “আবুল কাসিম” নামে পরিচিত হন। পরে জন্ম নেন যায়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা (রা.)। সন্তানদের প্রতি ছিল গভীর মমতা। সন্তানের মৃত্যু তাঁদের কষ্ট দিয়েছিল, কিন্তু তারা একে অপরকে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। শুধু সংসার নয়
নবুয়তের আগের বছরগুলোতে মুহাম্মদ (সা.) নির্জনতা পছন্দ করতে সেই সময় গুলোতেও খাদিজা রা ছিলেন সঙ্গী হিসেবে। তিনি সমাজের অন্যায়, মূর্তিপূজা, অবিচার দেখে ব্যথিত হতেন। মাঝে মাঝে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন।এই সময়েও খাদিজা (রা.) কখনো প্রশ্ন করে বিরক্ত করেননি। বরং খাবার পাঠিয়েছেন, খোঁজ নিয়েছেন, মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর এই সমর্থনই ছিল ভবিষ্যতের মহান দায়িত্বের জন্য প্রস্তুতির একটি নীরব অধ্যায়।
এই দাম্পত্য কেবল ইতিহাস নয়। এটি ভালোবাসার এমন এক নিদর্শন, যেখানে সম্পদ নয়, চরিত্র ছিল মূল শক্তি; কর্তৃত্ব নয়, ছিল সহমর্মিতা; আর আনুষ্ঠানিকতা নয়, ছিল হৃদয়ের গভীর বন্ধন।

সংসারের সেরা অভিভাবক স্ত্রী র সেরা বন্ধু ও স্বামী, ব্যবসায়ীদের কাছে আল আমিন, আরববাসীীর বিশস্ত যুবক সর্বদিক থেকে সেরা একজন মানুষ যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে রিসালাতের দায়িত্ব পেলেন। তিনি আতংকিত হলে ঘরে আসলেন খাদিজা রা সব শুনে শান্তনা দিলেন বললেন আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, দরিদ্রকে সাহায্য করেন, অতিথিকে আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পক্ষে থাকেন।
এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে যান তাঁর চাচাতো ভাই ওরাকা ইবন নওফালের কাছে।
ওরাকা ইবন নওফাল ছিলেন একজন বৃদ্ধ জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি তাওরাত ও ইঞ্জিল সম্পর্কে জ্ঞান রাখতেন এবং তাওহীদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কাছ থেকে সব শুনে বললেন :
এটি সেই নামুস (ফেরেশতা জিবরাইল), যিনি মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন।
হায়, আমি যদি তখন তরুণ হতাম।
যখন আপনার কওম আপনাকে বের করে দেবে, তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম, তবে আমি আপনাকে সাহায্য করতাম।
রাসুল (সা.) বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
তারা কি আমাকে বের করে দেবে?
ওরাকা বললেন, যে কেউ আপনার মতো বার্তা নিয়ে এসেছে, তার সাথেই শত্রুতা করা হয়েছে।
ওরাকার কথায় স্পষ্ট হলেন খাদিজা যে মুহাম্মদ সাঃ কোন সাধারন মানুষ নয় তিনি আল্লাহর রাসুল।
শির্কে ডুবে থাকা জাতিকে তাওহীদের দাওয়াত দিতে গিয়ে অনেক ঘাতপ্রতিঘাত সহ্য করতে হবে।

চলবে-


Share Option;

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *