এ পর্বে নবী ইউশা ও শহীদ নবী জাকারিয়া ও শহীদ নবী ইয়াহিয়া আঃ দেরকে নিয়ে-
ফেরাউন ডুবে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল- যেন সত্যের পথে সব বাধা শেষ। যেন জুলুমের সমাপ্তির সাথে সাথেই শুরু হবে শান্তির যুগ। কিন্তু বাস্তবে তখনই শুরু হলো মূসা (আ.)–এর জীবনের সবচেয়ে কঠিন দাওয়াতি অধ্যায়।
ফেরাউনের মৃত্যুর পর বনী ইসরাঈলের সামনে খুলে গেল স্বাধীনতার দিগন্ত। মুক্ত বাতাসে যখন তারা নিশ্বাস নিল,
মূসা (আ.) তাদের নিয়ে রওনা হলেন প্রতিশ্রুত ভূমির পথে। কিন্তু সমস্যা ছিল এক জায়গায়!
শরীর মুক্ত হয়েছিল,কিন্তু বহু হৃদয় তখনও বন্দি ছিল।
দাসত্বের শেকল পা থেকে খুলেছিল,কিন্তু চিন্তা থেকে খুলেনি। ফেরাউনের চাবুক থেমেছিল,কিন্তু মূর্তিপূজার ছায়া তখনও রয়ে গিয়েছিল অন্তরে।
পথেই তারা এক জাতিকে দেখল,যারা মূর্তি পূজা করছিল। তখন তারা নির্লজ্জভাবে বলল:
হে মূসা! আমাদের জন্যও একটি উপাস্য বানিয়ে দাও,
যেমন এদের উপাস্য আছে।
মূসা (আ.) স্তব্ধ হয়ে গেলেন। যে আল্লাহ তাদের চোখের সামনে সমুদ্র চিরে দিলেন, যে আল্লাহ ফেরাউনকে ডুবালেন,তাঁর পরও তারা চায়—একটি দৃশ্যমান মূর্তি!
ব্যথিত হৃদয়ে তিনি বললেন—তোমরা তো বড়ই অজ্ঞ জাতি। যে রব তোমাদের মুক্ত করেছেন,
তাঁকে ছেড়ে অন্য কাউকে উপাস্য বানাবে?
তিনি নতুন করে তাদের তাওহীদের শিক্ষা দিলেন।
বোঝালেন,যিনি সমুদ্র চিরে দেন,আসমান থেকে রিযিক দেন, যিনি জুলুম ভেঙে দেন তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নন।
এই পরিস্থিতিতে সেই রবই মুসা আঃ কে ডাকলেন,তিনি ডাকে সাড়া দিয়ে তূর পাহাড়ে গেলেন।
চল্লিশ রাত কাটালেন আল্লাহর সান্নিধ্যে। তাওরাত গ্রহণ করলেন—একটি জাতিকে গড়ার জন্য।
কিন্তু ফিরে এসে তিনি যা দেখলেন,তা ছিল ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। তার অনুপস্থিতিতে
সামিরী নামের এক ব্যক্তি সোনার গয়না গলিয়ে বানিয়েছে একটি বাছুরের মূর্তি।আর বনী ইসরাঈলের বড় একটি অংশ সেটাকেই বানিয়েছে উপাস্য।
কুরআন বলে: মূসার অনুপস্থিতিতে তাঁর কওম নিজেদের গহনা দিয়ে বাছুর বানাল(৭:১৪৮,২০:৮৮)
এটা শুধু অবাধ্যতা ছিল না।
এটা ছিল শির্ক,ছিল নবীর সাথে. বিশ্বাসঘাতকতা,
আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা। এটা দেখে মূসা (আ.)-এর হৃদয় ভেঙে গেল।
তিনি ফিরে এসে এতটাই ব্যথিত হলেন যে, তাওরাতের ফলক ফেলে দিলেন,নিজের ভাই হারুন (আ.)-এর মাথা ও দাড়ি ধরে বললেন তুমি কেন এদের থামালে না?(৭:১৫০)
তার রাগ ছিল,কিন্তু তার ভেতরে ছিল একজন নবীর কান্না।একজন দাঈর জ্বালা।একজন অভিভাবকের ভাঙা হৃদয়। তারা উল্টো অজুহাত দিল: আমরা তো বানাইনি, আমাদেরকে প্রলুব্ধ করা হয়েছে।তারা দোষ স্বীকার করেনি বরং দায় ঠেলে দিয়েছে।অবশেষে আল্লাহ তাদের তওবার জন্য কঠিন নির্দেশ দিলেন,যারা শির্ক করেছে, তাদেরকে নিজেদের মধ্য থেকেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।(সূরা আল-বাকারা ২:৫৪)
এই আদেশ মানা ছিল তাদের জন্য কঠিন,আর মূসা (আ.)-এর জন্য ছিল আরও বেশি বেদনাদায়ক।
তবুও তিনি থামেননি। তিনি কাঁদলেন।তিনি সতর্ক করলেন। তিনি শুদ্ধ করলেন। তিনি আবার শুরু করলেন
তাওহীদের দাওয়াত। শুরু হলো মরুভূমির জীবন।
মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে হযরত মুসা (আঃ) তাঁর কওমকে দেখলেন,কেউ ক্ষুধায় কাতর, কেউ তৃষ্ণায় অবসন্ন, কেউ আবার ভবিষ্যতের ভয়ে অশ্রুসজল। শিশুর কান্না, বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস, মায়েদের উৎকণ্ঠা—সব মিলিয়ে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সেই মুহূর্তে মুসা (আঃ) আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব, কিন্তু অন্তরে ছিল পূর্ণ তাওয়াক্কুল।
হে আমার প্রতিপালক, এই বান্দাদের তুমি-ই বের করে এনেছ। এখন তাদের রিজিকের ব্যবস্থাও তোমারই হাতে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীর দোয়া কবুল করলেন।
পরদিন ভোরে মরুভূমির দৃশ্য বদলে গেল। যেখানে গতকাল ছিল শুধু শুকনো বালু, সেখানে আজ শিশিরের মতো সাদা, কোমল এক বস্তু ছড়িয়ে আছে। লোকেরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। এ ছিল মান্না—আকাশ থেকে নেমে আসা মিষ্টি, পুষ্টিকর খাদ্য। আর সন্ধ্যার দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট পাখি নেমে এলো শিবিরে।
এগুলোই ছিল সালওয়া (কোয়েল পাখি)। সহজেই ধরা যেত, সহজেই রান্না করা যেত। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফুটল। মায়েরা সন্তানদের খাওয়াল, বৃদ্ধেরা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল, যুবকেরা নতুন শক্তি পেল।
প্রতিদিন ভোরে মান্না নামত, প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসত সালওয়া। আকাশ যেন নিজ হাতে তাদের জন্য রিজিক পাঠাত। এটা পেয়ে মরুভূমির নিস্তব্ধতা ভেঙে সকলে আলহামদুলিল্লাহর ধ্বনিতে শুকরিয়া আদায় করলো ।
আল্লাহ তাআলা তাদের জানিয়ে দিলেন,আজকের জন্য আজ নেবে, আগামী দিনের জন্য জমিয়ে রাখবে না। কারণ যিনি আজ দিচ্ছেন, তিনিই কালও দেবেন। এই কাহিনি শুধু খাদ্যের নয়, ভরসার। শুধু পেট ভরার নয়, ঈমান জাগানোর। মরুভূমির বুকে আল্লাহ দেখিয়ে দিলেন,,যেখানে মানুষের সব পথ বন্ধ, সেখানেই তাঁর রহমতের দরজা সবচেয়ে প্রশস্ত। আসমান থেকে নামা মান্না ও সালওয়া তার প্রমাণ ।পাথর উপর আঘাত করলে বেরিয়ে এলো বারোটি ঝরনা,খাবার ও পানি সমাধান আল্লাহ করে দিলেন।
আজও যখন আমাদের জীবন মরুভূমির মতো শুষ্ক মনে হয়, যখন চারপাশে শুধু অভাব আর অনিশ্চয়তা—তখন হযরত মুসা (আঃ)-এর সেই দোয়া আর মান্না–সালওয়ার সেই সকাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়:রিজিক আসে আকাশ থেকেই, আর ভরসা জন্মায় সিজদা থেকে।
বনী ইসরায়েলরা খাবার,পানি সাথে আল্লাহর নবী সাহচার্য পাওয়ার পরেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ছিল কৃপন। তারা কখনো বলতো খাবার একঘেয়ে। আবার
কখনো আল্লাহকে চোখে দেখার আবদার, আল্লাহর নবী মুসা আঃ কে সহযোগিতা করার অস্বীকার এবং মূসা (আ.)-এর ওপর অপবাদ দেওয়া কোন কিছুই বাদ দেয়নি তারা। কিন্তু মূসা (আ.) ধৈর্য ধরলেন।
সিজদায় পড়ে কাঁদলেন এবং আল্লাহর আদেশ পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। তিনি তাদের নামাজ শেখালেন,আইন শেখালেন,হালাল-হারাম শেখালেন।
তিনি তাদেরকে জুলুম ছেড়ে ন্যায়ের পথে ডাকলেন।
এতো কিছুর পরেও তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত
দাওয়াতের মাঝেই ছিলেন।
তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন: হে আল্লাহ, আমাকে পবিত্র ভূমির কাছাকাছি মৃত্যু দান করুন।
হাদীসে এসেছে,তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী স্থানে ইন্তিকাল করেন।
হযরত মুসা (আ.)-এর ইন্তিকালের পর আল্লাহ তায়ালা নবুয়তের ভার অর্পণ করেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর ও বিশ্বস্ত সাথী হযরত ইউশা‘ ইবনে নুন (আ.)-এর ওপর—যাঁকে বাইবেলের ভাষায় Joshua বলা হয়। তিনি শুধু একজন নবীই ছিলেন না, ছিলেন এক দৃঢ়চেতা নেতা, যাঁর ঈমান ছিল পাহাড়সম দৃঢ়, আর আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল অটল।
সে সময় বনী ইসরাঈলের অনেকেই ছিল ভীতু, যুদ্ধবিমুখ ও আল্লাহর নির্দেশ পালনে অনিচ্ছুক। অভিযোগপ্রবণতা ও দ্বিধাই যেন তাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর আগেও তারা কানআন (কিনআন) ভূমিতে প্রবেশে গড়িমসি করেছিল, যার ফলস্বরূপ তাদের দীর্ঘ বছর তীহ মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল—অনিশ্চয়তা ও পরীক্ষার জীবন বয়ে নিয়ে।
কিন্তু হযরত ইউশা (আ.) এলেন এক নতুন অধ্যায় নিয়ে।
দৃঢ় ঈমান ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে তিনি বনী ইসরাঈলকে নতুনভাবে সংগঠিত করলেন। তাঁর নেতৃত্বে তারা—
আল্লাহর নির্দেশে জিহাদে অগ্রসর হলো
কানআন ভূমিতে প্রবেশ করল
জেরিকো (আরিহা) সহ বিভিন্ন এলাকায় বিজয় অর্জন করল
যখন তারা সত্যিকার অর্থে নবীর নেতৃত্ব মেনে নিল, তখন আল্লাহর সাহায্য তাদের সঙ্গী হলো। অসম্ভবকে সম্ভব করে দিলেন তিনি।
বনী ইসরাঈলের নবীদের ধারাবাহিকতা
বনী ইসরাঈল এক গৌরবময় নবুয়তের ধারার বাহক। এই জাতির সূচনা হয় হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর মাধ্যমে যাঁকে মানুষ “ইসরাঈল” নামে চেনে। তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকেই আগমন করেন বহু নবী যেমন
হযরত ইউসুফ (আ.),
হযরত মুসা (আ.) ও হারুন (আ.),
হযরত আইয়ুব (আ.),
হযরত শু‘আইব (আ.) (আ.)
যেমনিভাবে তারা আগের নবীদের সাথে আচরণ করেছিল, শুরুতে তেমনই আচরণ করেছিল হযরত ইউশা (আ.)-এর সাথেও—সংশয়, অবাধ্যতা ও অবিশ্বাসে ভরা আচরণ। তবুও আল্লাহ তাঁর নবীকে সাহায্য করেন এবং সত্যকে বিজয়ী করেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
আর আমি বনী ইসরাঈলের মধ্যে বহু নবী প্রেরণ করেছি।হযরত ইউশা (আ.)-এর পর যেসব নবী বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রেরিত হন
আলোচনা সহজ করার জন্য উল্লেখ করা যায়, ইউশা (আ.)-এর পর এই জাতির মধ্য থেকে আগমন করেন আরও বহু নবী, যেমন:
হযরত দাউদ (আ.)
হযরত সুলাইমান (আ.)
হযরত ইলিয়াস (আ.)
হযরত আল-ইয়াসা‘ (আ.)
হযরত ইউনুস (আ.)
হযরত যাকারিয়া (আ.)
হযরত ইয়াহইয়া (আ.)
হযরত ঈসা (আ.)
তাঁরা প্রত্যেকেই এসেছিলেন একই আহ্বান নিয়ে—তাওহীদ,ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর আনুগত্য দাওয়াত দেওয়ার জন্য ।
যারা আল্লাহর নবীদের ডাকে সাড়া দিয়েছিল, তারা পেয়েছিল সম্মান, শান্তি আর সৌভাগ্য।
আর যারা মুখ ফিরিয়েছিল—তারা নিজেরাই নিজেদের ছিটকে ফেলেছিল আল্লাহর রহমতের দরজা থেকে।
বনী ইসরাঈলের এক অংশ ছিল এমনই…
অহংকার তাদের মাথা নষ্ট করে দিয়েছিল, ক্ষমতার মোহ তাদের চোখ অন্ধ করে দিয়েছিল, দুনিয়ার লালসা তাদের হৃদয় পাথর বানিয়ে ফেলেছিল।
এতটাই পাথর—যে তারা আল্লাহর নবীদের হত্যা করতেও কাঁপেনি।
কুরআনে এসেছে তারা অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করত
(সূরা আল-বাকারা ২:৬১)
এই শহীদ কাফেলার একজন ছিলেন নবী যাকারিয়া (আঃ)-
জেরুজালেমের পবিত্র প্রাঙ্গণে, বায়তুল মাকদিসের কোণে কোণে, এক বৃদ্ধ মানুষকে প্রায়ই দেখা যেত।
চুল ধবধবে সাদা, শরীর নুয়ে পড়া, কিন্তু চোখে ছিল আসমানের আলো। নীরব সাধনার এক আলো,অশ্রুসিক্ত ইবাদতের প্রতিক। তিনি ছিলেন নবী যাকারিয়া (আ.)।
দিনের পর দিন, বছরের পর বছর,ইবাদত, দাওয়াত আর দ্বীনের খেদমতেই কেটে গিয়েছিল তাঁর জীবন।
তিনি ছিলেন মারইয়াম (আ.)–এর অভিভাবক।
যেই মারইয়ামের কোল থেকেই একদিন দুনিয়ায় আসবেন ঈসা (আ.)।
লোকেরা যাকারিয়া আঃ কে খুব কম কথা বলতে দেখত,
কিন্তু আল্লাহর কাছে তাঁকে খুব বেশি কাঁদতে দেখত।
নীরব মসজিদ। নিভু নিভু প্রদীপ।
হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ নবী।চুল পেকে গেছে। শরীর ভেঙে পড়েছে।ঘরে কোনো শিশুর হাসি নেই।স্ত্রী বন্ধ্যা। ভবিষ্যৎ নিঃসঙ্গ।তবুও তাঁর রব বড়…
কম্পিত কণ্ঠে তিনি ফিসফিস করে বলেন—
হে আমার প্রতিপালক, আমাকে একা ছেড়ে দিও না।
তুমিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।
(আম্বিয়া ২১:৮৯)
একজন মানুষের একাকিত্ব,একজন নবীর উম্মতের চিন্তা,
আর এক বান্দার আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা।
এমন দোয়ার উত্তরে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন:
হে যাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি তার নাম হবে ইয়াহইয়া।(মারইয়াম ৭)
বার্ধক্যের শুকনো ডালে ফুটে উঠল নবুওতের ফুল।
ঘরে এলো এক শিশু, আর তার সাথে এলো নতুন নূর—
নবী ইয়াহইয়া (আ.)
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সন্তান লাভ করেন এ এক মহা আনন্দের। কিন্তু সন্তান, সংসার, সমাজ
যাকারিয়া (আ.)কে দ্বীন প্রচার থেকে দুরে সরান নি।
তিনি বাজারে গেলেন, মসজিদে গেলেন, মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে বললেন-
আল্লাহকে ভয় করো,
জুলুম ছেড়ে দাও,
ব্যভিচার থেকে ফিরে এসো,
দ্বীনকে দুনিয়ার দামে বিক্রি কোরো না।
ঠিক তখন থেকেই শুরু হলো তাঁর উপর নির্যাতন।
লোকেরা তাঁকে ব্যঙ্গ করত।
মসজিদের আঙিনায় তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি হতো।
শাসকদের দরবারে তাঁর নামে মিথ্যা ছড়ানো হতো।
ভণ্ড আলেমরা বলত, এই বৃদ্ধ মানুষটা সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করছে।
তিনি যখন মানুষের চোখে চোখ রেখে হক কথা বলতেন,
তারা মুখ ফিরিয়ে নিত,
কিন্তু আড়ালে আড়ালে দাঁত কামড়াত।
ধীরে ধীরে নির্যাতন শুধু কথায় সীমাবদ্ধ থাকল না।
তাঁকে একা করে দেওয়া হলো।
দাওয়াতের পথ সংকীর্ণ করা হলো।
মসজিদে তাঁর চলাফেরা নজরবন্দী করা হলো।
আর শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রাণ হালাল মনে করা হলো।
একদিন তিনি বুঝতে পারলেন,
আজ সত্য বলার মূল্য শুধু অপমান নয়, জীবন চলে যেতে পারে।
অত্যাচারীরা যখন তাঁকে ধরতে এলো,
তিনি পালালেন। এ পালানো কাপুরুষতায় নয়,
দাওয়াত বাঁচানোর আকুতিতে।
এক গাছের ভেতর আশ্রয় নিলেন।
আল্লাহর কুদরতে গাছ তাঁকে ঢেকে নিল।
কিন্তু শয়তান অত্যাচারীদের কানে ফিসফিস করে বলে দিল এইখানেই সে,তারপর শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যগুলোর একটিঃ
এক গাছ যার ভেতরে এক নবী, বাইরে একদল উন্মত্ত মানুষ।তাদের হাতে করাত!
একদিকে লোহার দাঁত কাঠে ঢুকছে…
অন্যদিকে এক নবীর ঠোঁটে জিকির…
কেউ শোনেনি তাঁর আর্তনাদ,কিন্তু আসমান শুনেছিল।
কেউ থামায়নি করাত,কিন্তু ফেরেশতারা সাক্ষী ছিল।
এইভাবেই বছরের পর বছর অপমান, নিপীড়ন আর একাকিত্ব বয়ে নিয়ে নবী যাকারিয়া (আ.)
চূড়ান্ত নির্যাতনের মধ্য দিয়ে আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করেন।
শহীদ নবী ইয়াহিয়া আঃ
শহীদ নবী হযরত ইয়াহইয়া (আ.) কোনো প্রাসাদের নবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিবেকের নবী,তিনি ছিলেন পবিত্রতার প্রতীক।সংযম ছিল তাঁর পোশাক,
নীরবতা ছিল তাঁর ভাষা,আর কান্না ছিল তাঁর ইবাদত।
তরুণ বয়সেই তার কাঁধে নেমে এসেছিল নবুওতের ভার,
আর হৃদয়ে নেমে এসেছিল আখিরাতের ভয়।
কুরআন যাঁকে পরিচয় করিয়ে দেয় :সংযমী, সদাচারী ও নবী সুলভ হিসেবে। তিনি হাসতেন কম,কাঁদতেন বেশি।
দুনিয়ার আরাম তাঁকে টানত না,কিন্তু মানুষের গুনাহ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত।
তিনি পথে নেমে বলতেন:
হালাল স্পষ্ট,হারাম স্পষ্ট,জুলুম জুলুমই,ব্যভিচার ব্যভিচারই, এগুলো রাজপ্রাসাদের জন্য হালাল হয়ে যায় না।
সেই সময় বনী ইসরাঈলের শাসক এক হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল-নিজের জন্য শরিয়তসম্মত নয় এমন এক নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে হারামকে হালাল করার জোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু দরবারের আলেমরা নীরব।
দরবারের কবিরা প্রশংসায় ব্যস্ত। চারপাশে শুধু চাটুকারিতা। আল্লাহর নবী হযরত ইয়াহইয়া (আ.) এটাকে মেনে নিতে পারছেন না। তিনি স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন!এ সম্পর্ক হারাম,আল্লাহ এটা অনুমতি দেননি।
এই একটি বাক্যেই কেঁপে উঠল সিংহাসন।
কারণ কামনা আর ক্ষমতার সামনে সত্য সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু।
শাসক ক্ষুব্ধ হলো নারীটি প্রতিশোধে অন্ধ হয়ে গেল। শুরু হলো চক্রান্ত, প্রথমে অপমান করা হলো,তারপর ভয় দেখানো হলো। এরপর বন্দী করা হলো।
অন্ধকার কারাগারে নবী দাঁড়িয়ে যেতেন নামাজে,নিরব কান্নায়, তাসবিহ র মধ্যে শেষ হয়ে যেতো রাত।
লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকত,আর সেই আলোয় দেখা যেত একটি মায়াবী মুখ,যা দুনিয়ার কাছে বন্দী,কিন্তু আসমানের কাছে মুক্ত।
তখন কামনার আগুনে জ্বলছিল রাজপ্রাসাদ রাজা প্রস্তুত
প্রতিশোধ নিতে, অপারাধী নারী কৌশলে বাদশাহর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিল
যা চাইব, তাই দিতে হবে।
আর সে চাইল আল্লাহর প্রিয় নবীর মাথা! কি ভয়ংকর প্রতিশ্রুতি কি ভয়ংকর চাওয়া, কি নিষ্ঠুরতা!
বিচার নেই,অপরাধ প্রমাণ নেই,আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই। নিজ কামনা পুরনে বাধা দেওয়া কারাগারে প্রবেশ করে খোলা তরবারি দিয়ে এক কোপে নবীর মাথা শরীর থেকে আলাদা করে ফেললো! তখনও নবীর ঠোঁটে আল্লাহর যিকির।
ইতিহাস বলে- তাঁর পবিত্র রক্ত তখনও জমিনে গড়িয়ে পড়ছিল,
আর তাঁর জবান তখনও আল্লাহর তাসবিহে নড়ছিল।
তাঁর মাথা রাখা হলো একটি থালায়।
আর সেই থালা পাঠানো হলো এক ব্যভিচারিণীর কাছে-
পুরস্কার হিসেবে।
শহীদী কাফেলায় শহীদ নবীদের নামের সাথে যুক্ত হলেন
শহীদ ইয়াহইয়া (আ.)। তিনি প্রমান করে গেলেন মিথ্যার সাথে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্যের সাথে মরে যাওয়া হাজার গুণ উত্তম।
চলবে- সভ্যতার উত্থান পতন :রক্তে লেখা ইতিহাস