গত সংখ্যার পর ইতিহাসে কম আলোচিত নবাতীয় ও সাবা জাতি নিয়ে এ পর্ব –
প্রাচীন ইতিহাসের বালুকাময় মরুভূমির গভীরে লুকিয়ে থাকা সভ্যতা গুলোর মধ্যে কম আলোচিত সাবা ও নবাতীয়দের গল্প, অথচ তাদের কীর্তি আজও মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে। আরব উপদ্বীপ ও লেভান্ত অঞ্চলের সেইসব বিস্ময়কর সভ্যতার মধ্যে সাবা ও নবাতীয় সভ্যতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উন্নত কৃষি ব্যবস্থা, সমৃদ্ধ বাণিজ্য ও কিংবদন্তিতুল্য শাসকদের জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকা সাবা সভ্যতা। এবং অসাধারণ নগর নির্মাণশৈলী, পানিসংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক দক্ষতার মাধ্যমে প্রাচীন বিশ্বের বিস্ময় সৃষ্টি করা নবাতীয় সভ্যতা।
দুদু মরুভূমির কঠিন পরিবেশকে জয় করা এই দুটি সভ্যতা কেবল টিকেই থাকেনি, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিল। ইতিহাসে কম আলোচিত এই সভ্যতা নিয়ে সংক্ষেপে তুলে ধরছি। আদ জাতি ধ্বংসের পর পর গড়ে ওঠা সভ্যতার নাম নবাতীয় ও সাবা সভ্যতা।
সাবা সভ্যতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ:ইয়েমেনের মারিব শহরকে কেন্দ্র করে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ – খ্রিষ্টীয় ৩ শতক পর্যন্ত গড়ে উঠে সাবা জাতি।
প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম বড় বাঁধ Marib Dam তাদের তৈরী। বর্তমান দক্ষিণ ইয়েমেন তাদের অনেক স্মৃতি রয়েছে। সাবাবাসীরা মূলত সেমিটিক জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরআনে উল্লিখিত রানী বিলকিস (শেবা রাণী) এই সভ্যতার অন্যতম কিংবদন্তিময় শাসক হিসেবে পরিচিত। সুবিন্যস্ত নগর ব্যবস্থা, উন্নত সেচ প্রযুক্তি ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যের জন্য তারা খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ধর্মীয় দিক বিবেচনায় প্রথমে সে সূর্য পুজোক হলেও পরবর্তীতে আল্লাহর নবী সোলাইমান আঃ এর আহবানে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নামল, ২৭ নং আয়াতে তার প্রমান মিলে। “হে আমার প্রতিপালক! আমি নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলাইমানের সঙ্গে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম—যিনি সমস্ত জগতের প্রতিপালক”।
ভৌগোলিক অবস্থান ও বাণিজ্যিক দক্ষতায় তার ভারত, আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে একচেটিয়া ধূপ, মসলা, সোনা ও মূল্যবান পাথরের ব্যাবসা করতেন। সাবা জাতীর অনেকেই তাওহীদের দাওয়াত গ্রহণ করলেও অবাধ্যদের সংখ্যাও কম ছিলো না। অবাধ্যর কারনে ধ্বংশ হয়ে যায় সূরা সাবা: আয়াত ১৫ থেকে ১৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন “নিশ্চয়ই সাবা জাতির জন্য তাদের বসবাসস্থলে ছিল একটি নিদর্শন—ডানে ও বামে দুটি বাগান।
(তাদের বলা হয়েছিল:) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের রিযিক থেকে আহার করো এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করো। কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিল।
অতঃপর আমরা তাদের ওপর ছেড়ে দিলাম ‘আরিমের বাঁধ ভাঙার বন্যা,এবং তাদের দুই বাগানকে বদলে দিলাম এমন দুই বাগানে,যেগুলোতে জন্মাত তিক্ত ফল, ঝাউ গাছ ও অল্প কিছু কুলগাছ।এভাবেই আমরা তাদেরকে শাস্তি দিলাম তাদের অকৃতজ্ঞতার কারণে।আর আমরা কি অকৃতজ্ঞ ছাড়া আর কাউকে শাস্তি দিই?আর আমরা তাদের ও সেই জনপদগুলোর মধ্যে—যেগুলোকে আমরা বরকতময় করেছিলাম—স্পষ্ট দৃশ্যমান বহু জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং সেখানে ভ্রমণের দূরত্ব নির্ধারণ করেছিলাম।(বলেছিলাম:) তোমরা সেখানে নিরাপদে রাত ও দিনে ভ্রমণ করো।
কিন্তু তারা বলল,”হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের সফরের দূরত্ব বাড়িয়ে দাও।”আর তারা নিজেদের প্রতি জুলুম করল। অতঃপর আমরা তাদেরকে কাহিনিতে পরিণত করলাম
এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম।
নিশ্চয়ই এতে রয়েছে নিদর্শন—প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ মানুষের জন্য”।
নবাতীয় জাতির পরিচয়
আরবি ভাষাভাষী ও বাণিজ্যনির্ভর একটি জাতির নাম ছিল নবাতীয়। তারা আরব উপদ্বীপের উত্তরে লেভান্ত অঞ্চলে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যার ভৌগোলিক সীমা বিস্তৃত ছিল বর্তমান জর্ডান, সৌদি আরবের উত্তরাংশ, দক্ষিণ সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল পর্যন্ত। পেত্রা নগরীকে রাজধানী করে নবাতীয়রা এই রাষ্ট্র পরিচালনা করত।খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টাব্দ ১ম শতাব্দী পর্যন্ত নবাতীয়রা
আরব থেকে রোম ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বেশ দাপটের সাথে বাণিজ্য পরিচালনা করে অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠে। আদ ও সমুদ জাতীর মত তারাও
পাহাড় কেটে তৈরি সমাধি ও প্রাসাদ তৈরী করতো।যার প্রমাণ রাজধানী পেত্রার “খাজনেহ”স্থাপত্যে সেখানে
গ্রিক, রোমান ও আরবি শিল্পরীতির সংমিশ্রণ রয়েছে।
ধর্মপালনের দিক থেকে তারা দেবতার পূজা করতো যা সম্পন্ন শীর্ক। এ সময়ে পৃথিবীতে হযরত আইয়ুব, ইউনুস, ইলিয়াস,আল-ইয়াসা,যাকারিয়া,ইয়াহইয়া ও
ঈসা (আ.) এর আগমন হয়েছিল কিন্তু নবাতীয়দের জন্য সুস্পষ্ট কোন নবী ছিলেন কি না তা আমি সঠিক তথ্য দিয়ে বলতে পারতেছিনা। তবে আল্লাহ বলেছেন “আর আমি প্রত্যেক জাতির কাছেই একজন সতর্ককারী পাঠিয়েছি।
(সূরা ফাতির: ২৪) সে আলোকে নবাতীয়দের কাছেও নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সতর্ককারী (নবী বা রাসূল) পাঠানো হয়েছিল।
রোমান সম্রাট ট্রাজান সাম্রাজ্যের বিস্তারের জন্য আগ্রাসান চালিয়ে ১০৬ খ্রিস্টাব্দে নবাতীয় অন্ঞ্চল দখল করে নেয়।
প্রিয় পাঠক,ইতোমধ্যে আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে আমি সভ্যতার ইতিহাস ও তাদের ধ্বংসের কারণ গুলো তুলে ধরছি শুধু এটা স্পষ্ট করতে যে-যারাই তাওহীদের বিপরীতে গিয়ে দাম্ভিকতা করেছে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। ক্রমান্বয়ে আমি কাওমে লুত কাওমে মাদায়েন,ফেরাউন, আসহাবুল আইকা ও আসহাবুর রাস সকলে বিষয়ে আপনাদের সামনে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরবো,
চলবে – বই – সভ্যতার উত্থান -পতন: রক্তে লেখা ইতিহাস – লেখক – আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ্