ভূমধ্যসাগরের নীল স্রোতের বুকে ভেসে থাকা সিসিলি যেন এক অপার রহস্যময়তার দ্বীপ—যেখানে ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সভ্যতা মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে সংস্কৃতির অনন্য সেতুবন্ধন। ইতিহাস, ভূ-রাজনীতি ও মানবসমাজের পারস্পরিক টানাপোড়েন এই দ্বীপকে করেছে বহুবর্ণ ও বহুমাত্রিক। তবে অষ্টম ও নবম শতাব্দীর সিসিলি ছিল বিশৃঙ্খলা, অবিচার ও প্রশাসনিক অস্থিরতার এক অন্ধকার অধ্যায়।
বাইজেন্টাইন শাসনের অবক্ষয় ও মানুষের দুর্দশা:
তৎকালীন সময় সিসিলি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীন। কিন্তু দুর্বল প্রশাসন, কঠোর করনীতি, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং লাগাতার বিদ্রোহে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুঃসহ ও অনিরাপদ। শান্ত ও সমৃদ্ধ জীবনযাত্রা বদলে যায় ভয় ও অনিশ্চয়তার ছায়ায়। মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ ছিল সামান্য, আর শাসকদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ভার বহন করতে হতো সাধারণ জনগণকে।
এই অস্থিরতার মাঝে এক নাটকীয় মোড় আসে। বাইজেন্টাইন নৌ-কমান্ডার ইউফেমিওস, সাম্রাজ্যের অবিচার ও স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সিসিলিবাসীর নিরাপত্তার জন্য সাহায্যের হাত বাড়ান উত্তর আফ্রিকার আগলাবিদ আমির জিয়াদাতুল্লাহ প্রথম–এর দিকে। তার এই আহ্বান ছিল মানুষের মুক্তি, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ প্রশাসন নিশ্চিতকরণের আগ্রহ থেকে উদ্ভূত।
মুসলমানদের আগমন: দখল নয়, মানবতার দায়িত্ববোধ
ইউফেমিওসের অনুরোধকে আগলাবিদ আমির হালকাভাবে নেননি। সিসিলির মানুষের দুর্দশা, বাইজেন্টাইনের শাসনব্যর্থতা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তিনি সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এটি ছিল দখলদারির ইচ্ছা নয়, বরং এক মানবিক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ—যা মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ন্যায়পরায়ণতা ও উদারতার চিহ্ন হয়ে ইতিহাসে স্থান পায়।
মুসলিম বাহিনী সিসিলিতে পৌঁছালে বহু স্থানীয় মানুষ তাদের স্বাগত জানায়। তারা বিশ্বাস করত—এই আগমন তাদের ভগ্ন নিরাপত্তা, বিচারহীনতা ও অস্থিরতার অবসান ঘটাবে। মুসলিম সেনারা স্থানীয়দের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে দ্বীপজুড়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুরু করেন।
অশান্ত সিসিলির মানুষদেরকে নিরাপত্তা ও বাইযানটাইনদের হাত থেকে রক্ষা করতে মুসলিম বাহিনী কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করতে হয়,যেমন-
১. মাযারা বিজয় (৮২৭ খ্রিষ্টাব্দ)
সিসিলিতে মুসলিম বাহিনীর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিল মাযারা। কৌশলগতভাবে জরুরি এই উপকূলীয় শহর পরবর্তী অভিযানের ভিত্তি রচনা করে। এটি ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ।
২. পালের্মো বিজয় (৮৩১খ্রিষ্টাব্দ)
পরবর্তীতে পালের্মো মুসলিম প্রশাসন, বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এখানে গড়ে ওঠে সমন্বিত সমাজব্যবস্থা যেখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায় একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত। কৃষি ও স্থাপত্যশিল্পে আসে নতুন যুগের সূচনা।
৩. মেসিনা (৮৪১) ও এননা (৮৫৯খ্রিষ্টাব্দ)
এই দুটি অঞ্চলের দখল সিসিলির অভ্যন্তরে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে। বিশেষ করে এননা ছিল অতি শক্তিশালী দুর্গ। এর পতনের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনের ভিত্তি আরও দৃঢ় করেন।
৪. তাউরমিনা বিজয় (৯০২খ্রিষ্টাব্দ)
প্রায় ৭৫ বছরের সংগ্রামের পর তাউরমিনা মুসলিম শাসনের আওতায় আসে। এর মধ্য দিয়ে সিসিলি সম্পূর্ণভাবে মুসলিম প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং দ্বীপে শুরু হয় স্থায়ী শান্তি, ন্যায় ও উন্নয়নের যুগ।
মুসলিম শাসকগনের শাসনকাল:
১) আঘলাবি শাসনকালীন সময়ে সিসিলি ইফ্রিকিয়া (বর্তমান তিউনিসিয়া) থেকে নিযুক্ত গভর্নর বা সেনাপতির মাধ্যমে শাসিত হতো।
প্রথম গভর্নর: আসাদ ইবনে আল-ফুরাত (৮২৭–৮২৮)
দ্বিতীয়: মুহাম্মদ ইবনে আবি আল-জাওয়ারি (৮২৯–৮৩২)
তৃতীয়: আবু ফিহর মুহাম্মদ ইবনে আবদাল্লাহ (৮৩২–৮৩৭)
চতুর্থ: আল-ফাদল ইবনে ইয়াকুব (৮৩৭–৮৪৮)
পঞ্চম: আব্বাস ইবনে আল-ফাদল (৮৪৮–৮৫২)
ষষ্ঠ: আবু ইবরাহিম আহমদ (৮৫২–৮৫৩)
এর পর একাধিক আঘলাবি গভর্নর ৮৫৩ থেকে ৯০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সিসিলি শাসন করেন।
আঘলাবি শাসনের অবসানের প্রধান কারণ ছিল,
শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও দুর্বলতা,
নরম্যানদের সামরিক শক্তির উত্থান ও ধারাবাহিক আক্রমণ,
উত্তর আফ্রিকায় আঘলাবি রাজবংশের পতন (৯০৯ খ্রি.),
এবং কেন্দ্রীয় শাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব।
এই সব কারণের ফলে সিসিলি থেকে আঘলাবি শাসনের বিলুপ্তি ঘটে।
আঘলাবি শাসনামলে সিসিলির পালের্মো (Palermo) একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাজধানীতে পরিণত হয় এবং তা প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।
আঘলাবিদের পতনের পর সিসিলি প্রথমে সরাসরি ফাতিমীয়দের অধীনে থাকে। পরবর্তীতে ফাতিমীয় খিলাফত কালবি বংশকে সিসিলির শাসক হিসেবে নিযুক্ত করে। যদিও কালবিরা ফাতিমীয় খিলাফতের অধীনস্থ ছিলেন, বাস্তবে তারা প্রায় স্বাধীনভাবে সিসিলি শাসন করেন।
কালবি আমিরগণ ও তাঁদের শাসনকাল
আল-হাসান আল-কালবি — ৯৪৮–৯৫৪
আহমদ ইবনে আল-হাসান — ৯৫৪–৯৬৯
আবু আল-কাসিম আলি — ৯৬৯–৯৮২
জাবির ইবনে মুহাম্মদ — ৯৮২–৯৮৩
আবদাল্লাহ ইবনে আবু আল-কাসিম — ৯৮৩–৯৮৯
ইউসুফ ইবনে আবদাল্লাহ — ৯৮৯–৯৯৮
জাফর ইবনে ইউসুফ — ৯৯৮–১০১৯
আহমদ আল-আখাল — ১০১৯–১০৩৬
হাসান আল-সামসাম — ১০৩৬–১০৫৩
কালবি শাসকদের পরিবারের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সুযোগে ১০৬১ খ্রিস্টাব্দে নরম্যান খ্রিস্টানরা রজার দ্য ফার্স্ট-এর নেতৃত্বে সিসিলি আক্রমণ শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সব অন্ঞ্চল দখল করে নেয়।
ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ঐতিহ্য সমূহ :
আগলাবিদ, ফাতিমিদ ও কালবী বংশের ধারাবাহিক মুসলিম শাসনে পরিচালিত প্রায় আড়াই শতাব্দীর সেই স্বর্ণালী যুগ আজও সিসিলির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে অম্লান ছাপ রেখে গেছে। স্থাপত্য, কৃষিব্যবস্থা, নগরায়ণ, ভাষা ও রন্ধনশিল্প—সবখানেই মুসলিম সভ্যতার উজ্জ্বল ছায়া আজও জীবন্ত হয়ে আছে।
যেমন-
(এক)ঐতিহাসিক পালের্মো শহর যাকে মুসলিম শাসনামলে “মাদিনাতুস সালাম” বলা হতো আর এটা ছিলো সিসিলির রাজধানী। আজও শহরটির রাস্তাঘাট, বাজার, পুরনো নগর কাঠামো আরব-মুসলিম নগরায়ণের স্পষ্ট পরিচয় বহন করে। যেমন-সরু রাস্তা, বাজারভিত্তিক সিটি প্ল্যান,পুরনো দুর্গ ও পাহারাঘর,আরবি নামের এলাকা: “Al-Kasr” → বর্তমান Alcazar / Cassaro
(দুই)কাসর আল-আজিজাহ
১২শ শতাব্দীতে নরমান রাজারা নির্মাণ করলেও এর স্থাপত্য পূর্ণরূপে আরব-মুসলিম প্রকৌশল দ্বারা তৈরি।
এটি মূলত মুসলিম স্থপতি ও কারিগরদের কর্ম।
যাতে আরবি জল-শীতলীকরণ ব্যবস্থা,আরব ঘরানার খিলান,জ্যামিতিক দেয়াল অলংকরণ,অভ্যন্তরে কুরআনিক নকশার প্রভাব এখনো দেখা যায়।
(তিন) মুসলিম জলের বাগানশিল্পের অনন্য নিদর্শন Cuba কুব্বা (গম্বুজ)।
এটার মূল স্থাপত্যকার ছিলেন মুসলিমেরা, নরমানরা শুধু পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল।যার চিহ্ন;আরবি অর্ধচন্দ্র খিলান,জলনির্ভর আরব-আন্দালুসীয় বাগানের ডিজাইন,ঘরের মধ্যে শীতল বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা (Arab cooling system)
(চার) আরব নকশার মোজাইকে La Martorana (Santa Maria dell’Ammiraglio) গির্জা সজ্জিত হয়। যার মধ্যে অন্যতম-আরবি ক্যালিগ্রাফির চিহ্ন,খিলান ও স্তম্ভে মুসলিম নকশা,জ্যামিতিক আরব মোজাইক।
(পাঁচ) সেচব্যবস্থা Qanat (কানাত) :পালের্মোতে নিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ জলধারা–ভিত্তিক সেচব্যবস্থা Qanat / Kanāt চালু করেন মুসলিমরা।যা আজও পালের্মো শহরের নিচে সেই জলস্রোতের সুড়ঙ্গ টিকে আছে।
(ছয়) ইসলামী বাগানশৈলী (Giardino Arabo)
মুসলিম শাসকেরা “জান্নাতুল-আরব” কনসেপ্টে চার ভাগে বিভক্ত বাগান (Chahar-bagh) তৈরি করেন।
আজও সিসিলির বিভিন্ন প্রাসাদে ও গ্রামীণ অঞ্চলে সেই আরব বাগানশৈলী দেখা যায়।
(সাত)বিভিন্ন স্থান আরবী নামে রয়েছে যেমন :
Marsala ← মার্সা আল্লাহ
Calatafimi ← কালআত ফীমি (দুর্গের ওপরে)
Caltagirone ← কালআত জিরুন
Caltavuturo ← কালআত আবু তুর
Misilmeri ← মিস্র আল-আমীর (আমীরের শহর)
লেখক –
আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ্ ( মানবাধিকার কর্মী)