১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
রাত ১:০৬
১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
রাত ১:০৬

সভ্যতার উত্থান পতন :রক্তে লেখা ইতিহাস (১৪তম পর্ব)- আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ্)।

Share Option;

বু‘আসের রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে মদিনা রাষ্ট্রের উত্থান:

উত্তপ্ত বালুর শহর মক্কা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এক ঐতিহাসিক সফর শেষে যখন মুহাম্মদ সাঃ ইয়াসরেব/মদিনার উপকণ্ঠে পৌঁছালেন, তখন শুধু একজন মানুষ নয়, একটি আশার আলো এসে দাঁড়াল বিভক্ত এক জনপদের দরজায়।
শহর তখন প্রতীক্ষায় ছিল। আনসাররা প্রতিদিন প্রখর রোদে শহরের বাইরে গিয়ে পথ চেয়ে থাকত। খবর এলেই ছুটে যেত কিশোরেরা। আর যেদিন তিনি এলেন, সেদিন যেন মদিনার আকাশটাই বদলে গেল। ঘরগুলোর ছাদে ভিড়, রাস্তায় উচ্ছ্বাস, কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনি। শিশুদের কণ্ঠে ভেসে উঠল স্বাগতগান—
তা’লা আল বাদরু আলাইনা
মিন ছানি’য়া তিল –ওয়া’দা
ওজাবাশ শুক’রু আলাইনা
মা দা আ লিল্লাহি দা
আইয়্যু হা’ল মাব উ’ছু ফিনা
জি’তা বি’ল-আম্রিল -মু’তা
জি’তা শার’রাফ তা’ল-মদিনা
মারহাবান ইয়া খাইরা দা
ঐতিহাসিক সেই আবেগময় মুহূর্ত, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্মরণীয় হয়ে আছে।
প্রথমে তিনি থামলেন কুবায়। সেখানে গড়ে উঠল প্রথম মসজিদ, যা শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না, ছিল নতুন সমাজের ভিত্তি। এরপর যখন তিনি উটনীর পিঠে চড়ে শহরে প্রবেশ করলেন, মানুষ চাইছিলেন তিনি তাদের ঘরে থাকুন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিলেন আল্লাহর ইচ্ছার উপর। উটনী যেখানে বসে পড়ল, সেখানেই স্থির হলো তাঁর বাসস্থান।একটি সরল উঠোন, যেখান থেকে শুরু হলো ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। মদিনা বা ইয়াসরিব তখন ক্ষতবিক্ষত এক জনপদ।
বু‘আসের যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি।
বু‘আসের প্রান্তর শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না। এটি ছিল ভ্রাতৃঘাতী উন্মত্ততার প্রতীক।
সেদিন সূর্য উঠেছিল স্বাভাবিক নিয়মে, কিন্তু অস্ত গিয়েছিল লাশের স্তূপের ওপর দিয়ে। দুই পক্ষের বীরেরা প্রাণ দিয়েছিল। নেতৃত্ব ভেঙে পড়েছিল। শক্তিশালী পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল।
যুদ্ধ শেষ হয়েছিল, কিন্তু শান্তি আসেনি।
শহর ছিল ক্লান্ত। ঘরে ঘরে শোক। শিশুদের চোখে ভবিষ্যতের বদলে ভয়। প্রতিটি বিজয় ছিল ক্ষতবিক্ষত। প্রতিটি পরাজয় ছিল অপমানের আগুন।
মানুষ বুঝতে শুরু করল, এই পথে চললে ইয়াসরিব একদিন নিজেই নিজেকে ধ্বংস করবে।
সমস্যার গভীরতা কোথায় ছিল?
সমস্যা শুধু দুই গোত্রের ছিল না।
সমস্যা ছিল নেতৃত্বের সংকটে।
যার হাতে ক্ষমতা, তার হাতে ছিল পক্ষপাত।
যার হাতে তরবারি, তার হাতে ছিল প্রতিশোধ।
একজন নিরপেক্ষ, নৈতিকভাবে উচ্চতর, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব ছিল না।
শক্তি ছিল, কিন্তু দিকনির্দেশ ছিল না।
সাহস ছিল, কিন্তু সংযম ছিল না।
সংখ্যা ছিল, কিন্তু ঐক্য ছিল না।
ইয়াসরিবের মানুষ বুঝেছিল,
নিজেদের ভেতরের নেতৃত্ব দিয়ে তারা সমস্যার সমাধান করতে পারছে না।
একজন বাইরের, ন্যায়পরায়ণ, দূরদর্শী নেতৃত্ব দরকার।
যিনি গোত্রের নয়, নীতির পক্ষে দাঁড়াবেন।
যিনি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন।
যিনি বিভাজন নয়, ঐক্যের ডাক দেবেন
তারা খুঁজছিল এমন একজন নেতৃত্ব, যিনি প্রতিশোধের চক্র ভাঙতে পারবেন। গোত্রের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায় ও শৃঙ্খলার নতুন ভিত্তি স্থাপন করবেন। যখন মুহাম্মদ মক্কা থেকে হিজরত করে ইয়াসরিবে পৌঁছালেন, তখন তিনি শুধু একজন নবী হিসেবে আসেননি; তিনি এসেছিলেন ভাঙা সমাজকে নতুন চুক্তির বন্ধনে বাঁধতে, বৈরিতার জায়গায় ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করতে, আর বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলোকে একটি নীতিনিষ্ঠ রাষ্ট্রচিন্তার দিকে পরিচালিত করতে। সেই ক্ষতচিহ্নের ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছিল নতুন এক অধ্যায়—মদিনা রাষ্ট্র। যেখানে গোত্র নয়, ন্যায় ছিল পরিচয়; প্রতিশোধ নয়, ছিল সংহতি; এবং ক্ষমতার অহংকার নয়, ছিল দায়িত্ববোধের শাসন। এই রূপান্তরের গল্প কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, এটি মানুষের মনোজগতের আমূল পরিবর্তনের ইতিহাস।

মক্কায় নির্যাতিত মুসলমানদের একটি অংশ মদিনায় আশ্রয় নেয়। তাঁদের বলা হতো মুহাজির। মদিনার মুসলমানরা ছিলেন আনসার। দুই ভিন্ন পটভূমির মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু নবী মুহাম্মদ প্রথমেই হৃদয়ের বন্ধন তৈরি করলেন। তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন। অর্থ, সম্পদ, ঘর, সব কিছু ভাগ করে নেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি হলো।
অশান্ত ইয়াসরেব বা মদিনাতে শাম্তি স্থাপন করতে তৈরী হলো মদিনার সনদ। যা ছিল ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, বহুধর্মী, বহুগোত্রীয় সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা।
সনদের মূল বিষয়গুলো ছিল:
সব গোত্র একটি সম্মিলিত উম্মাহ বা নাগরিক সমাজের অংশ হবে
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে
অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে
রক্তপণ ও প্রতিশোধের সীমা নির্ধারণ করা হবে
যুদ্ধ ও শান্তির সিদ্ধান্ত হবে সম্মিলিতভাবে
বিরোধ দেখা দিলে চূড়ান্ত মীমাংসা হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিচার অনুযায়ী
এটি ছিল কেবল মুসলমানদের জন্য নয়। ইহুদি গোত্রগুলোও এই সনদের অংশ ছিল। তাদের ধর্ম পালনে স্বাধীনতা ছিল। তাদের নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের দায়িত্বে ছিল।
এই সনদ এক নতুন ধারণা দিল। নাগরিকত্বের ভিত্তি হবে চুক্তি ও ন্যায়, কেবল রক্তসম্পর্ক নয়।
রহমাতুল্লিল আলামিনের নেতৃত্বের বিশেষত্ব ছিল তাঁর ন্যায়পরায়ণতা। তিনি কোনো গোত্রকে বিশেষ সুবিধা দেননি। তাঁর কাছে অপরাধী মুসলমান হলেও বিচার হতো, আর নির্যাতিত যদি অমুসলিমও হতো, তার অধিকার রক্ষা পেত।
তিনি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। প্রতিশোধের জায়গায় ক্ষমা, বিভেদের জায়গায় ঐক্য, শত্রুতার জায়গায় আস্থা স্থাপন করেছিলেন। মদিনা ধীরে ধীরে রক্তাক্ত সংঘর্ষের শহর থেকে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হলো।প্রতিষ্ঠিত হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। গরিবের হক নিশ্চিত হলো। জাকাতের ব্যবস্থা গড়ে উঠলো। নারীর অধিকার, এতিমের অধিকার, দুর্বল মানুষের সুরক্ষা। সবকিছুই একটি সুসংহত কাঠামোর ভেতরে এল। এই পরিবর্তন ছিল ধীরে ধীরে, কিন্তু গভীর। কয়েক বছরের মধ্যেই মদিনা আর আগের মতো রইল না। যেখানে আগে তরবারির ঝনঝনানি শোনা যেত, সেখানে শোনা গেল ন্যায়বিচারের ঘোষণা।
অশান্ত মদিনার বুকে নবী মুহাম্মদ যে শান্তির বীজ বপন করেছিলেন, তা ছিল নৈতিক নেতৃত্বের শক্তির প্রমাণ। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজ বদলাতে হলে আগে মানুষের হৃদয় বদলাতে হয়।
মদিনার ইতিহাস তাই কেবল একটি শহরের কাহিনি নয়। এটি একজন নবীর নেতৃত্বে বিভক্ত সমাজের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার গল্প।
স্বপ্ন ছিল বিভক্ত মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করানোর। আউস ও খাজরাজ।যারা দীর্ঘদিন রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে ছিল—ইসলাম গ্রহণের পর একে অপরের বুকে জায়গা করে নিল ভাইয়ের মতো। শত্রুতার আগুন নিভে গিয়ে জ্বলে উঠল ভ্রাতৃত্বের আলো।
মুহাজিররা মক্কা থেকে সব হারিয়ে এসেছিল।ঘর, সম্পদ, আপনজনের সান্নিধ্য। কিন্তু তারা হারায়নি আশা। আর আনসাররা শুধু তাদের আশ্রয়ই দেয়নি, হৃদয়ের দরজাও খুলে দিয়েছিল। এই মিলন ছিল ইতিহাসে এক বিরল মানবিক অধ্যায়।
অন্যদিকে মদিনার ইহুদি গোত্রগুলো—বনু কায়নুকা, বনু নাদীর ও বনু কুরাযা—তাদের সঙ্গেও শুরুতে গড়ে উঠেছিল পারস্পরিক আস্থার এক চুক্তি। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: সবাই মিলেই একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়া। সেই সময় মদিনা সত্যিই ছিল শান্তি ও সহাবস্থানের প্রতীক।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, আস্থা যখন টলে যায়, তখন সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে। চুক্তিভঙ্গ ও অবিশ্বাস ধীরে ধীরে সেই সম্ভাবনাকে ক্ষয় করতে থাকে। যে শহর একসময় ঐক্যের শক্তিতে উজ্জ্বল ছিল, সেখানে বিভাজনের ছায়া নেমে আসে।
এই অভিজ্ঞতা মুসলমানদের একটি গভীর শিক্ষা দিয়েছিল: একটি সমাজ টিকে থাকে চুক্তির প্রতি আনুগত্য, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর। যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ সম্মিলিত কল্যাণের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন ভাঙন অনিবার্য। কিন্তু হৃদয় যদি প্রশস্ত হয়, উদ্দেশ্য যদি হয় ন্যায় ও ঐক্য—তবে ইতিহাসের গতিপথও বদলে যায়

বদর
মক্কার কুরাইশরা যখন দেখল, নির্যাতন সহ্য করে মুসলমানরা সবকিছু ছেড়ে মদিনায় এসে নতুন জীবন গড়ছে, তাদের ক্রোধ থামেনি। যারা হিজরত করেছিল, তাদের ঘরবাড়ি, সম্পদ, ব্যবসা—সব দখল করা হলো। তবু প্রতিহিংসার আগুন নিভল না। লক্ষ্য একটাই—এই নবীন শক্তিকে শেকড়েই থামিয়ে দেওয়া।
মদিনায় গড়ে উঠেছিল ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য সমাজ। মুহাজির ও আনসার একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে এমন বন্ধনের নজির স্থাপন করেছিলেন, যা ইতিহাসে বিরল। এই ঐক্যই কুরাইশদের আতঙ্কিত করল। তারা প্রায় এক হাজার সৈন্য নিয়ে বের হলো, নেতৃত্বে ছিল আবু জাহল। উদ্দেশ্য স্পষ্ট—মদিনার নবগঠিত মুসলিম সমাজকে নিশ্চিহ্ন করা।
অন্যদিকে মুসলমানদের সংখ্যা মাত্র ৩১৩ জন। হাতে গোনা কয়েকটি ঘোড়া, অল্প উট, সীমিত অস্ত্র। বাহ্যিক শক্তিতে তারা ছিল দুর্বল। কিন্তু অন্তরে ছিল অটল ঈমান, গভীর ঐক্য, আর আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা। তাদের শক্তি ছিল বিশ্বাসের শক্তি।
মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি বদর প্রান্তরে মুখোমুখি হলো দুই দল। মরুভূমির মাঝে কয়েকটি কূপ ঘিরে ছোট্ট এক স্থান—কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানরা আগে পৌঁছে পানির উৎসগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিলেন। যুদ্ধের আগের রাত ছিল নীরব, ভারী, গভীর। কেউ ইবাদতে, কেউ অশ্রুসিক্ত দোয়ায়। প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) দুই হাত তুলে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। সেই প্রার্থনায় ছিল শুধু একটি যুদ্ধের ফল নয়, ছিল পুরো উম্মাহর ভবিষ্যৎ।
দিনটি ১৭ রমজান, ২ হিজরি। সূর্য উঠল, আর শুরু হলো এক নির্ণায়ক লড়াই—বদরের যুদ্ধ। ইতিহাস যেন থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিল, সংখ্যায় কম এক দল মানুষ কীভাবে প্রবল শক্তির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। প্রাণপণ লড়াই চলতে থাকল। বদর কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না। এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার সরাসরি মুখোমুখি হওয়া। এটি ছিল দীর্ঘ অপমানের পর আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম।
সংখ্যায় ও অস্ত্রে পিছিয়ে থেকেও মুসলমানরা বিজয় অর্জন করলেন। এই বিজয় মদিনার সমাজে ফিরিয়ে আনল আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় করল রাজনৈতিক অবস্থান, আরবের গোত্রগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিল। প্রমাণিত হলো—শক্তির আসল উৎস বাহ্যিক সামর্থ্য নয়, আদর্শ ও বিশ্বাস।
এই যুদ্ধে শহীদ হন ১৪ জন সাহাবি—৬ জন মুহাজির, ৮ জন আনসার।
মুহাজির সাহাবি (৬ জন):
১. হযরত উবায়দা ইবনুল হারিস (রা.)
২. হযরত উমাইর ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রা.)
৩. হযরত জুল-শিমালাইন উমাইর ইবনু আবদে আমর (রা.)
৪. হযরত আকিল ইবনুল বুকাইর (রা.)
৫. হযরত সাফওয়ান ইবনুল বাইদা (রা.)
৬. হযরত মিহজা (রা.)
আনসার সাহাবি (৮ জন):
৭. হযরত হারিসা ইবনু সুরাকা (রা.)
৮. হযরত আউফ ইবনুল হারিস (রা.)
৯. হযরত মুআওয়ায ইবনুল হারিস (রা.)
১০. হযরত ইয়াজিদ ইবনুল হারিস (রা.)
১১. হযরত রাফে ইবনুল মুআল্লা (রা.)
১২. হযরত সাদ ইবনু খাইসামা (রা.)
১৩. হযরত মুবাররিদ ইবনু আবদুল মুনযির (রা.)
১৪. হযরত মাবাদ ইবনু কায়স (রা.)
অন্যদিকে কুরাইশদের বহু প্রভাবশালী নেতা নিহত হয়, যেমন আবু জাহেল, উতবা ইবনে রাবিয়া, শাইবা ইবনে রাবিয়া, ওয়ালিদ ইবনে উতবা, উমাইয়া ইবনে খালফ। মোট সত্তর জন নিহত এবং সত্তর জন বন্দি হয়।
মাত্র ৩১৩ জন, আল্লাহর মেহেরবানীতে, তিনগুণ শক্তিশালী বাহিনীর ওপর বিজয় লাভ করলেন। বাহ্যিক হিসাবে যা অসম্ভব মনে হয়েছিল, বদর প্রমাণ করল সংখ্যা নয়, ঈমানই আসল শক্তি।
বদর যুদ্ধের বিজয় কেবল একটি সামরিক সাফল্য নয়; এটি ছিল নির্যাতিত ও ঘরছাড়া মুসলমানদের জন্য আশ্বাসের আলো। মক্কায় বছরের পর বছর অত্যাচার সয়ে তারা যখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন এই বিজয় তাদের হৃদয়ে স্থিরতা এনে দিল। তারা অনুভব করলেন, সত্যের পথে অবিচল থাকলে আল্লাহর সাহায্য আসে এমনভাবে, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
এই দিন পরিচিতি পায় ইয়াওমুল ফুরকান’—সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণের দিন হিসেবে। এই দিনে আল্লাহ সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যখন মানুষ সত্যকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়ায়। তখন বাহ্যিক শক্তি পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়।
দুনিয়ার সামান্য ক্ষমতায় যারা একদিন কাবার চত্বরে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠত, নির্দেশ দিত, মানুষকে অপমান করত, সেদিন তারা নিথর পড়ে রইল বদরের বালুচরে। ক্ষমতার যে অহংকার এতদিন বুক ফুলিয়ে হাঁটত, তা এক মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
বদরের ময়দানে শুধু কয়েকজন মানুষ নিহত হয়নি; পতন ঘটেছিল এক মানসিকতার। যে শক্তি নিজেকে অজেয় ভাবত, সে বুঝে গেল ইতিহাসের মালিক সে নয়।
মক্কায় ফিরে শোক নেমে এলো। নারীরা চুল ছিঁড়ে কাঁদছিল, বুক চাপড়ে মাতম করছিল। কিন্তু সেই শোকও ছিল অদ্ভুতভাবে নিয়ন্ত্রিত। কুরাইশ নেতারা জনসমক্ষে অতিরিক্ত বিলাপ করতে নিষেধ করেছিল। তাদের ভয় ছিল, মদিনায় মুসলমানরা যেন আনন্দ না পায়। তাই কান্না ছিল চাপা, কিন্তু প্রতিশোধের আগুন ছিল প্রকাশ্য।
পরাজয়ের পর নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন আবু সুফিয়ান। বদরের আঘাত তার ব্যক্তিগতও ছিল; আত্মীয়স্বজন নিহত। তিনি শপথ করলেন, প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই।
মক্কার ব্যবসায়ী ও নেতারা সিদ্ধান্ত নিলেন, সিরিয়া থেকে ফেরত আসা বাণিজ্য কাফেলার লাভ যাবে যুদ্ধ তহবিলে। অর্থ, অস্ত্র, মানুষ—সব প্রস্তুত করা হবে নতুন সংঘর্ষের জন্য।
সরাসরি তরবারির পাশাপাশি শুরু হলো নীরব কৌশল।
মদিনার আশপাশের গোত্রগুলোকে উসকে দেওয়া
মুসলমানদের অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা
অভ্যন্তরীণ বিভেদ তৈরির পরিকল্পনা
মদিনায় অবস্থানরত ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা চলল, যাতে ভেতর থেকে অস্থিরতা তৈরি হয়। বদরের পরাজয় ছিল কেবল সামরিক ব্যর্থতা নয়; আরব সমাজে এটি ছিল মর্যাদার পতন। আর সেই মর্যাদা রক্ষার অজুহাতে তারা প্রস্তুত করল আরেক সংঘর্ষের মঞ্চ।ইতিহাসের এক গভীর সত্য আছে,অনেক সময় একটি পরাজয়ই পরবর্তী যুদ্ধের বীজ বপন করে। বদরের আঘাত থেকে জন্ম নিল উহুদ যুদ্ধ।

বিজয়ী মুসলমানগন বদরের প্রান্তরে বিজয়ের পতাকা উত্তোলন করলেন । কিন্তু সেই আকাশ ছিল অশ্রুসজল। ত্রয়োদশ বছরের নির্যাতন, বঞ্চনা আর হিজরতের বেদনা বুকে নিয়ে যারা দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের চৌদ্দজন প্রিয় সাহাবী সেদিন শাহাদাতের অমর মর্যাদা লাভ করেন।
তাঁরা ছিলেন কারও পিতা, কারও ভাই, কারও সন্তানের আশ্রয়। বিজয় এসেছিল, কিন্তু হৃদয়ে রয়ে গিয়েছিল শূন্যতা। বিজয়ী মুসলমানরা উল্লাসে আত্মহারা হননি। তাঁরা শহীদদের স্মরণ করে বিনম্র হয়েছেন। কারণ এই বিজয় তাদের রক্তের বিনিময়ে।
এই শোক ছিল দুর্বলতার নয়; ভালোবাসার। এই অশ্রু ছিল পরাজয়ের নয়; ঈমানের গভীরতার প্রকাশ।
মনে কষ্ট থাকা শর্তেও যুদ্ধে বন্দি হওয়া কুরাইশ নেতা ও সৈন্যদের সাথে কঠোর আচরন করেন নি।
অনেক বন্দীকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলো। যারা অর্থ দিতে পারেনি, তাদের কেউ কেউ মদিনার দশজন শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার শর্তে মুক্তি পেল। যুদ্ধের উত্তাপে প্রতিহিংসা নয়, ন্যায় ও দয়ার সমন্বয় ঘটল।
এ এক অসাধারণ উদাহরণ। বিজয় মানে কেবল প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা নয়; নিজের চরিত্রকে উঁচুতে তুলে ধরা।
মানবতার নবী ও তাঁর সাহাবীগণ বুঝতেন, প্রকৃত সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে। তাই ময়দানে জীবন বাজি রেখে লড়াই যেমন আছে, তেমনি দাওয়াতের পথে ক্ষমা, ধৈর্য ও উদারতাও আছে। বদর এক রক্তে লেখা ইতিহাস।

চলবে-


Share Option;

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *